শিশুরোগ

বাচ্চার জ্বর – এর সকল কথা

ছোট থেকে বড় হওয়ার মধ্যে যে কোনো শিশু বহুবার জ্বর নিয়ে ভোগে। সকল মা-বাবা-ই বাচ্চার জ্বর এবং জ্বর কমানো নিয়ে বহুবার নাজেহাল হয়েছেন।

কখোনো জ্বর বহুদিন ধরে কমছেনা, তো কখনো ওষুধ খাওয়ালেও কমছেনা। কখনো বা ওষুধ খেয়ে 3 ঘন্টার পরেই জ্বর চলে আসছে তো কখনো 7-8 ঘন্টা জ্বর থাকছেনা। কখনো বা জ্বর নিয়েই বাচ্চা ছুটে খেলে বেড়াচ্ছে, তো কখনো ঝিমিয়ে পড়ে শুয়ে আছে। কখনো ফ্যান চালাতে বলছে, কখনো গায়ে চাদর ঢাকা দিতে চাইছে, তো কখনো কাঁপছে। আবার কোনো কোনো বাচ্চা ভুল বকছে, তো কোনো বাচ্চার খিঁচুনী শুরু হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বমিও করে দিচ্ছে। আর খাচ্ছেনা তো কেউ কিছুই। urine, stool-ও কম হচ্ছে।

এরকম না না প্রকারের রকম ভেদে জ্বর হতে পারে।

জ্বর না না কারণে হতে পারে। সাধারণ ভাইরাল জ্বর থেকে শুরু করে বুকের কফ, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, urine ইনফেকশন, পেটের ইনফেকশন, হাম, পক্স, মাম্পস, চামড়ার ইনফেকশন, আর্থ্রাইটিস, রক্তের রোগ, এমনকি আরো অনেক ছোট বড় বা খুব বড় সব রকমেরই রোগে জ্বর হতে পারে।

এখানে মনে রাখা ভালো যে জ্বর কোনো রোগ নয়। জ্বর একটি উপসর্গ মাত্র। এবং শুনতে অবাক লাগলেও, জ্বর হওয়া ভালো!

জ্বর হওয়া ভালো? হ্যাঁ। কারণ এই যে জ্বর হয় বলেই রোগের লক্ষণ বুঝতে পারা যায়। যেমন ধরুন শরীরে একটা বাজে ইনফেকশন হলো, ধরুন টাইফয়েড বা ম্যালেরিয়া বা urine ইনফেকশন বা অন্য কোনো ইনফেকশন যেমন আগেই উল্লেখ করেছি। এবার বাচ্চার জ্বর হোলনা। আপনি তো খুব খুশি প্যারাসিটামল খাওয়াতে হবেনা। কিন্তু আপনি ডাক্তারবাবুর কাছেও গেলেন না। যাবেন কেন? জ্বর তো হয়নি। এদিকে রোগ প্রচন্ড বেগে ছড়িয়ে গেল শরীরে এবং মারাত্মক প্রাণঘাতী আকার ধারণ করলো। কাজেই জ্বর হয় বলেই আমি আপনি রোগের গতি প্রকৃতি বুঝতে পারি। জ্বর টা কমিয়ে দেওয়া বিশেষ বীরত্বের কাজ নয়, যে কারণে জ্বর হচ্ছে, সেটা সারানোই হলো আমাদের আসল লক্ষ।

আপনি ভাবছেন এরকমও আবার হয় নাকি? হয়। এবং সেই জন্যই বলা। উদাহরণ দিই? বুঝতে সুবিধা হবে। একদম প্রতিটি মা-বাবার নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই এটা পড়ে। দেখি কেমন হয়।

ধরুন বাচ্ছার কোনো একদিন জ্বর হলো। আপনি খুব উদ্বেগের মধ্যে পড়লেন। আপনার শিশুচিকিৎসক তো আপনাকে প্যারাসিটামল কেমন করে দিতে হবে বয়স ও ওজন অনুযায়ী বলেই দিয়েছেন। আপনিও তা দিয়েছেন নিয়ম মেনেই। 

এদিকে জ্বর বিশেষ কমছেনা। জ্বর হয়তো কমলো, কিন্তু 103^F থেকে নেমে 100^F তে এসে আটকে গেলো। আর কমেনা। অথবা কমলো, কিন্তু 3-4 ঘন্টা যেতে না যেতেই আবার জ্বর ফিরে এলো। 

আপনার শিশুচিকিৎসক বললেন, গা-হাত-পা মোছান। আর কয়েকদিন জ্বর এর একটা চার্ট লিখে রাখুন। 

এদিকে জ্বর এসেই চলেছে। আপনি সেই একই প্যারাসিটামল-এ আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে গেলেন আর এক পাড়ার কারুর কাছে। যিনি শুনেই বললেন, এটা কোনো সমস্যাই নয়। একটি ওষুধের নামও বলে দিলেন। আর বললেন যে, যাকে যাকে তিনি এটা দিয়েছেন, জ্বর কমেনি হয়নি। এটাও বললেন যে কোনো এক  ভেলোরের বিখ্যাত ডাক্তারবাবু তাঁর কোনো এক ন-পিসির খুড় শাশুড়ির ননদের বাড়িওয়ালার জামাইবাবুর বোনের ছেলেকে দিয়েছিলেন। তার কোনো এক কঠিন অসুখ হয়েছিল। ম্যাজিকের মতো জ্বর কমে যায়। 

তিনি কিন্তু বললেন না, কেন, কখন, কোন রোগে, আর কি কি ওষুধের সাথে দিয়েছিলেন। আর আপনিও জানতে চাইলেন না। আপনার তো জ্বর কমানো তখন একমাত্র চিন্তা।

এসেই এক ডোজ। ব্যাস। সেই যে ঘাম দিয়ে জ্বর 96^F তে নেমে গেল আর 7-8 ঘন্টার আগে জ্বর আসেই না।

আপনি তো ভীষণ খুশি। ভাবলেন শুধু প্যারাসিটামল-এ পড়ে থাকলে হবে!! ভেলোরের ডাক্তার দিয়েছিল বলে কথা।

এদিকে 2-3 দিন পর থেকে বাচ্ছার জ্বর তো আর আসেনা। কিন্তু মারাত্মক দুর্বল হয়ে যেতে থাকলো। শুধু তাইই নয়। নতুন নতুন উপসর্গ যেগুলো ছিলোনা, সেগুলোও হতে থাকল। বমি, পেট ব্যাথা, দুর্বলতা ইত্যাদি।

এবার আপনি ভয় পেলেন। ছুটলেন আবার আপনার শিশুচিকিসকের কাছে। উনিও একটু অবাকই হলেন। জ্বরও তেমন আসছেনা, অথচ বাচ্চা এত খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রক্ত পরীক্ষা করতে দিলেন। এলো ডেঙ্গু। শুধু তাই নয়। রক্ত কমে গেছে এবং আরো অনেক গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে। ভর্তি করতে হোলো। 7 দিনের যমে-মানুষে টানাটানি করে বাচ্চা সুস্থ্য হলো।

উপরের উদাহরণ টিতে কি ঘটেছিল?

রোগটা যদি ডেঙ্গু বা অন্য যে কোনো গভীর ইনফেকশন না হয়ে, যদি সাধারণ একটা ভাইরাল জ্বর হতো, তাহলে কিন্তু কোনো সমস্যাই হতোনা। দিব্বি 3-4 দিনের মধ্যেই জ্বর ও রোগ দুইই ভালো হয়ে, আপনার ওই ওষুধ কিন্তু একদম হিরো হয়ে যেত।

কিন্তু সমস্যাটা এইখানেই। 

জ্বর গায়ে লিখে আসেনা, যে আমি সাধারণ ভাইরাল জ্বর, আমি ম্যালেরিয়া, কি আমি অন্য কিছু জ্বর। সেটা একমাত্র আপনার শিশু চিকিৎসকই পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন। সেই বোঝার একটা উপায় হলো জ্বর এর প্রকৃতি বোঝা। প্যারাসিটামল হলো এমন একটা ওষুধ, যেটা সঠিক ডোজে শুধুমাত্র জ্বর এর তীব্রতা ক্ষনিকের জন্য কমিয়ে দেয়। কিন্তু জ্বরের প্রকৃতিতে কোনো বিশেষ প্রভাব ফেলেনা। তাই রোগ নির্ণয় করতে সুবিধা হয়।

কিছু ওষুধ আছে যেগুলো আসলে জ্বর এর ওষুধ নয়। অন্য রোগে ব্যবহার হয়। কিন্তু দিলে জ্বরও কমে। শুধু কমেই না, খুব শক্তিশালী ওষুধ হওয়ায় বেশিই কমে। ফলে জ্বর কমে গেলেও জ্বরের প্রকৃতি পাল্টে যায়।

জ্বর কমে যায় এমন কিছু ওষুধে আবার ইনফেকশন বেড়েও যেতে পারে। এছাড়া সাইড এফেক্ট তো আছেই।

তাহলে এতকিছুর পর করণীয় কি?

প্রথম করণীয় আপনার শিশুচিকিৎসকের কথা শুনুন। আমি আপনাদের বোঝাবো কেন ও কিভাবে।

জ্বর হলেই আতঙ্কিত হবেন না। জ্বর কমানোর জন্য অবশ্যই চেষ্টা করবেন। কিন্তু পাগলের মতো কেন 99^F রয়ে যাচ্ছে, 97^F হচ্ছেনা, তা নিয়ে ভাববেন না। আপনি বেশি উতলা হলে, বিনা কারণে বেশি ওষুধ পড়বে। যেগুলো বেশিরভাগই শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, ক্ষতিকারকও।

প্যারাসিটামল নির্দিষ্ট ডোজে খুবই সেফ। তবে এটা ঠিকই যে, এটা খুব শক্তিশালী জ্বর কমানোর ওষুধ নয়। কিন্তু আমাদের অত শক্তিশালী ওষুধ দরকারও নেই। কাজেই শুধুই প্যারাসিটামল-ই দিন।

আর গা মোছান। মনে রাখবেন, স্নান করানো বা মাথায় জলপট্টি দেওয়া খুব ভালো পদ্ধতি নয়।

ছোট গামছা নিন 3-4 টে। সাধারণ কলের জল একটা বালতিতে নিয়ে গামছা গুলি ভিজিয়ে দিন। এরপর এক একটা গামছা চেপে জল বার করে শরীরের বিভিন্ন অংশ মুড়ে দিন। যেমন একটা দিয়ে বুক পিঠ চাদরের মতো করে মুড়ে দিন। আর দুটো পায়ে দুটো, দুটো হাতে দুটো। আর একটা দিয়ে ঘাড় মাথা কপাল।

এরপর ফ্যান চালিয়ে 5 মিনিট এরকম রাখুন। তারপর সবগুলো খুলে আবার ভিজিয়ে জড়িয়ে দিন। এরকম ভাবে বেশ কয়েকবার করুন, যতক্ষণ না গায়ের তাপ কমে।

এরপরের প্রশ্ন কখন প্যারাসিটামল দেব বা গা মোছাবো?

এখানে জেনে রাখা ভালো 28 দিন বয়স পর্যন্ত প্যারাসিটামল দেয়া উচিত নয়। এই বয়স এর নবজাতকের লিভার প্যারাসিটামল সহ্য করতে পারেনা। এই সময় জ্বর সাধারণত হলে ইনফেকশন এর জন্য হয়না। এই বয়সে ইনফেকশন হলে জ্বর কচ্চিদ হয়। বেশিরভাগই তাপমাত্রা কমে ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই জ্বর হলে সত্ত্বর ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নেয়া উচিত। ইনজেকশন দিতে হয় ইনফেকশন হলে।

তবে সুখের কথা এই বয়সের জ্বর সাধারণত শরীরে জলের অভাবের জন্য হয় (ডিহাইড্রেশন)। তাই গা মুছিয়ে, আর বেশি বার বার বুকের দুধ খাওয়ালে জ্বর কমে যায়। অবশ্যই যদি নবজাতকের জ্বর ছাড়া অন্য কোনো উপসর্গ না থাকে এবং শিশু বুকের দুধ ভালোকরে টেনে নিজে খেতে পারে। তবেই নিশ্চিন্ত হতে পারেন।

নবজাতক ছাড়া একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে এবং বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া 101^F এর উপর জ্বর থাকলে তবেই ওষুধ দেয়া উচিত। জ্বর-এর ওষুধ দেয়ার পর কিছুক্ষন সময় দিতে হবে জ্বর কমার জন্য। সাধারণত 20-40 মিনিট অবধি সময় লাগতে পারে জ্বর কমার জন্য। যদি ওষুধ দেওয়ার পরও জ্বর না কমে, তাহলে গা মোছানো উচিত। অবশ্যই উপরোক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী।

তার মানে 100^F জ্বর থাকলে ওষুধ দেবেন না? হ্যাঁ। ঠিকই পড়ছেন। 101^F এর বেশি তাপমাত্রা না হলে ওষুধ লাগবে না। কি করবেন? কিছুই না। শুধু বারে বারে তাপমাত্রা দেখুন 101^F পেরোলো কিনা। পেরোলেই ওষুধ।

এবার ওষুধ তো দিলেন। জ্বর কমলো। কিন্তু 100^F এ এসে আটকে গেলো। আর নামলনা। চিন্তা নেই। থাক। একটু গা মোছাতেও পারেন। না করলেও ক্ষতি নেই। আবার লক্ষ রাখুন কখন বাড়ছে এবং 101^F পেরোলো কিনা।

আরেকটা জিনিস হতে পারে। জ্বর তো কমলইনা। উল্টে 101^F থেকে বেড়ে 102 বা 103^F হয়ে গেল। হতেই পারে। ভয় পাবেন না। এবার গা মোছানো শুরু করুন। কমান তাপ। 101^F এর নিচে নামানো আপনার কাজ। সেটা করে ফেলুন। ব্যাস। একই ভাবে আবার লক্ষ রাখুন আবার জ্বর কখন বাড়ছে। সাধারণত প্যারাসিটামল 4 ঘন্টা জ্বরের উপর কাজ করে।

পরিশ্রম বেশী হবে ঠিকই। কিন্তু বাচ্চার ক্ষতি হবেনা। আর যদি অন্য কোনো ওষুধ দিতেই হয়, আপনার শিশু চিকিৎসক নিজেই দেবেন। চিন্তা নেই। সমস্যা হবে না।

একটা কথা তো বলতে ভুলেই গেছি। যে কোনো বাচ্চার জ্বর হলে শরীরে জলের বেশী প্রয়োজন পড়ে। তাই ৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের বেশি করে বুকের দুধ খাওয়ান। আর তার চেয়ে বড় শিশুদের জল বা কোনো তরল খাদ্য বা ORS বার বার খাওয়ানো উচিত। 

এতে শিশু দুর্বল হয়না। আর হ্যাঁ। শুনতে অবাক লাগলেও জ্বরও তাড়াতাড়ি কমে।

এগুলো বললাম সব শিশুর সাধারণ জ্বরের জন্য। কিন্তু যে শিশুদের জ্বর হলেই খিঁচুনী হয়, তাদের জন্য নিয়ম একটু অন্য।

পরের পোস্ট-এ জ্বর-এর খিঁচুনী নিয়ে আলোচনা করবো।

আপনার প্রশ্ন ও মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই comment এ লিখুন।

পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

4 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *